মৌচাষ ও মধু উৎপাদন বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক উপ-খাত। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মধু উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি জ্ঞান ও বিপণন সহায়তা প্রদান করা হলে সম্ভাবনাময় এ উপ-খাতটি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। গুনগতমান সম্পন্ন মধু উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি আমদানির উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করা যেতে পারে। দেশের মৌচাষ ও মধু উৎপাদন উপ-খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ফর সোস্যাল এডভান্সমেন্ট (বাসা) ২০০৬ সাল থেকে কাজ করে আসছে।

সম্প্রতি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন Promoting Agricultural Commercialization and Enterprises (PACE) প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র-উদ্যোগ খাতের উন্নয়নে আর্থিক সেবা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্ভাবনাময় কৃষি ও অকৃষি উপ-খাতের উন্নয়নে ভ্যালু চেইন উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। (PACE) প্রকল্পের ভ্যালু চেইন কার্যক্রমের আওতায় পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ফর সোস্যাল এডভান্সমেন্ট (বাসা) মৌপণ্য-খাতের সাথে জড়িত উদ্যোক্তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে “টেকসই মৌচাষ উন্নয়ন ও মধু বিপণনের মাধ্যমে মৌচাষীদের আয় বৃদ্ধিকরণ” শীর্ষক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ০৫ টি জেলার ১৩ টি উপজেলায় উক্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের এক সফল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

টেকসই মৌচাষ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকায় নিন্মোক্ত কর্মকান্ড সম্পাদিত করা হচ্ছে

  • মৌচাষ কার্যক্রমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে প্রকল্পের শুরুতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত একটি বেইজ লাইন সার্ভে সম্পাদন।
  • ৩১৪ জন মৌচাষীদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান।
  • ৪০০০ জন মৌফসল উৎপাদনকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, মৌচাষ সম্প্রসারণে সম্পৃক্তকরণ এবং উদ্বুদ্ধকরণ
  • মৌচাষ এবং মধু শিল্পের বর্তমান পর্যায়, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং বিপণন ব্যবস্থাপনার উপর উপজেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে কর্মশালার আয়োজন ।
  • মৌপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে মেলায় অংশগ্র বাংলাদেশে প্রথমবারের মত মৌচাষীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর মৌচাষে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির স্বার্থে মির্জাপুরের পেকুয়ায় বাসা ট্রেনিং এন্ড রিসার্চ সেন্টার (বিটিআরসি) তে একটি মিনি ল্যাবরে মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়নের ফলে ফসল ও ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি হয় এ বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা।
  • আধুনিক প্রযুক্তিতে মৌচাষকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে বিদেশী মৌচাষ বিশেষজ্ঞদের এনে মাঠ পর্যায়ে মৌচাষীদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান।
  • মৌচাষের সফলতা অধিক অর্জনের লক্ষ্যে বিদেশ থেকে লাগসই প্রযুক্তি সম্বলিত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ।
  • উক্ত প্রকল্পের আওতায় ভোক্তা সাধারনের কাছে মধুর ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশ হতে মধুর মিনিপ্যাক মেশিন আমদানির মাধ্যমে মধু মিনিপ্যাক আকারে বাজারজাত করা।

  • বর্তমানে দেশের জন্য ৩টি বিষয় অপরিহার্য যেমন বর্ধিত খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পুষ্টি উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। মৌমাছি, মৌচাষ এবং মধু উৎপাদন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে উক্ত ৩টি বিষয়েই অসামান্য অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে ০৪ প্রজাতির মৌমাছি পাওয়া যায়, যেমন এপিস মেলিফেরা, এপিস সেরানা, এপিস ডরসাটা এবং এপিস ফ্লোরিয়া। এর মধ্যে এপিস মেলিফেরা এবং এপিস সেরানা প্রজাতির মৌমাছি বানিজ্যিকভাবে মৌবাক্রো চাষ হয়। বর্তমানে এপিস মেলিফেরা জাত হতে শতকরা ৯৫ ভাগ মধু উৎপাদন হয়। গড়ে প্রতি বছর বিশে^ প্রায় ১.৮ মিলিয়ন টন মধু উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪,০০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদিত হয়। এ উৎপাদন দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৩০% পূরণ করে থাকে। এ হিসাবে দেশে মধুর মোট চাহিদা ১৩,৩৩৩ মে.টন। বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট মধুর প্রায় ২০% আসে সুন্দরবন থেকে। দেশের প্রায় সব জেলায় কম/বেশী মধু উৎপাদন বা মৌমাছি পালন করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফুলের নির্যাস থেকে মৌমাছি নেকটার সংগ্রহ করে মধু তৈরি করে, মৌয়ালীরা এ মধু সংগ্রহ করে থাকে। ।

    বর্তমানে দেশে প্রধানত: সরিষা, লিচু, ধনিয়া, কালোজিরা এবং সুন্দরবন অঞ্চলের খলিসা, গড়ান, কেওড়া, বাইন, কাকড়া ইত্যাদি গাছের ফুল থেকে বেশিরভাগ মধু উৎপাদতি হচ্ছে। এছাড়া সাজনা এবং মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন সব্জি এবং আঁশ জাতীয় ফসল থেকে অল্প পরিমান মধু উৎপাদিত হচ্ছে।

    মধুর গুনাগুন ঃ

    মধুর রং, স্বাদ ও গন্ধ মৌমাছির সংগৃহীত মিষ্টরসের ধরনের উপর নির্ভরশীল। এর প্রধান রাসায়নিক উপাদান ফ্রুক্টোজ (levulose) এবং ডেক্সট্রোজ (glucose)| এছাড়া সুক্রোজ, প্রোটিন, পটাসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, লৌহ, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, ক্লোরিন, গন্ধক এবং ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘কে’ ও ‘ই’ এতে উপস্থিত থাকে। ক্যালরিক মান প্রায় ৩,০৪০ ক্যালরি/কিলোগ্রাম ।

  • শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে সুস্থ্য ও সবল দেহে দীর্ঘায়ু লাভ ত্বরান্বিত করে।
  • পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে।
  • সর্দিকাশি এবং ঠান্ডাজনিত অসুস্থ্যতাসহ ক্ষত নিরাময়ে ভূমিকা রাখে।
  • শরীরে তাৎক্ষনিক শক্তি জোগায় এবং হৃদপিন্ডকে শক্তিশালী করে।
  • রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রন করে এবং ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
  • দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি, ওজন হ্রাস নিয়ন্ত্রন, শ্বাসনালী সংক্রমন ও হাঁপানী নিয়ন্ত্রন, পেটের পীড়া এবং বমিভাব নিয়ন্ত্রন করে।

    মধুর রাসায়নিক বৈশিষ্ট ঃ

  • মধুতে এন্টি-অকিা্রডেন্ট বিদ্যমান যা ক্যান্সার এবং হৃদরোগ প্রতিরোধ করে।
  • এন্টি-অকিা্রডেন্ট শরীরের কোষকে তার কাঠামো ধ্বংসের হাত থেকে সুরক্ষা করে। অন্যথায় ধ্বংসকৃত কোষ ক্ষতিকারক বস্তু (Toxin) সৃষ্টি করে যা ক্যান্সার এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • তুলনামূলকভাবে গাড়ো এবং লালচে বাদামী ধরনের মধুতে এন্টিঅক্্িরডেন্ট বেশী।
  • মধু রক্তের ক্ষতিকারক এলডিএল কোলেষ্টোরোল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড হ্রাস করে।
  • মধু রক্তের উপকারী এইচডিএল কোলেষ্টোরোল বৃদ্ধি করে।
  • শরীরে রোগ সৃষ্টিকারী উপাদান হোমোসিস্ট াইন এর মাত্রা হ্রাস করে।
  • ভেজাল মধু চেনার উপায়:

  • খুবই হালকা। কাত করলে দ্রুত বোতলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাবে।
  • সমপরিমান মধু এবং মেথিলেটেড স্পিরিটের মিশ্রন দুধের ন্যায় সাদা হবে।
  • ম্যাচের কাঠির বারুদ লাগানো অংশ মধুতে ডুবিয়ে ম্যাচের খোলে ঘর্ষন করলে আগুন জ্বলবে না।
  • পানিতে ঢাললে প্রথমে অস্বচ্ছ দেখাবে এবং তাৎক্ষনিক ভাবে সরাসরি মিশ্রিত হবে।
  • ২০ গ্রাম মধুতে ৫-৭ ফোটা এ্যানিলিন ক্লোরাইড দিয়ে নাড়াচাড়া করলে ননীর মত লালচে রং ধারন করবে।
  • মধুর সেবন বিধি ঃ

    সকল বয়সের মানুষ নিয়মিত এবং পরিমিত মধু পান করলে সুস্থ্য ও সবলদেহে দীঘার্য়ু লাভ করতে পারে। মধু শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ও নিয়মানুযায়ী পরিমিত মধু পান করা উচিত।

  • নবজাত শিশু (জন্মের পর হতে ১ বছর) ঃ মধু সেবন নিষেধ।
  • শিশু (১বছর পর হতে ৫ বছর) ঃ ১.৫- ২ চা চামচ।
  • কিশোর (৬ - ১৮ বছর) ঃ ২ - ৩ চামচ।
  • যুবক (১৯ - ৩৫ বছর) ঃ ৪ - ৫ চামচ।
  • মধ্যবয়সী (৩৬ - ৫০ বছর) ঃ ৩ - ৪ চামচ।
  • বয়স্ক ( ৫১ এর উর্দ্ধে) ঃ ২-৩ চামচ।
  • ফোটানো পানি উষ্ণ গরম অবস্থায় মধু মিশিয়ে (পানি ৩ ঃ মধু ১) পান করলে পূর্ন ফল পাওয়া যায়।
  • উষ্ণ গরম দুধের সাথে এবং চায়ের সাথে মধু পান উপাদেয়।
  • প্রতিদিন সকালে নাস্তার সাথে ১-২ চামচ মধু পান করা উত্তম।
  • বাসা সংস্থার আদি (aadi) মধুর গুনাগুন ঃ

  • বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ফর সোস্যাল এডভান্সমেন্ট ‘বাসা’ সংস্থার নিজস্ব খামার এবং মৌচাষীর নিকট হতে মধু সংগ্রহ করে দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মী দ্বারা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে টাংগাইল জেলাস্থ মির্জাপুর উপজেলার পেকুয়াতে বাসা ট্রেনিং এন্ড রিসার্চ সেন্টার (বিটিআরসি) তে অত্যাধুনিক মেশিনে মধু প্রক্রিয়াজাত এবং বোতলজাত করে বাজারজাত করছে।
  • স্বাস্থ্যসম্মত এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মধু হতে অতিরিক্ত পানি, ময়লা ইত্যাদি অপসারণ করে ১০০% বিশুদ্ধ এবং পরিশোধিত করে আদি (aadi) মধু প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
  • প্রকৃতির বিভিন্ন ফুল যেমন সরিষা, লিচু, ধনিয়া, কালোজিরা, বড়ই, খলশি, কেওড়া, গড়ান ইত্যাদি থেকে আহরিত মধু ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ১০০০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম, ১০০ গ্রাম, ৫০ গ্রাম ওজনের আকর্ষনীয় বোতলে বাজারজাত করা হয়।
  • আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন আদি (aadi) মধু বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেষ্টিং ইনস্টিটিউট (BSTI) কর্তৃক অনুমোদিত এবং মান নিয়ন্ত্রিত।
  • বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় ভোক্তা সাধারনের কাছে মধুর ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে যেমন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের তথা শিশুদের নিকট গ্রহণযোগ্য, চায়ের সাথে মিশিয়ে মধু পানে উৎসাহিত করা এবং ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার বিষয় বিবেচনায় রেখে সদূর চীন হতে উন্নত প্রযুক্তির মধু মিনিপ্যাক মেশিন আমদানি করা হয়েছে। উক্ত মিনিপ্যাক “আদি মধু” নামক ব্র্যান্ডে বিভিন্ন সুপার সপ, ফার্মেসি, পাড়া মহল্লার মুদি দোকান, গ্রোসারি সপ ইত্যাদিতে পাওয়া যাচ্ছে।

  • aadi honey